একাত্তরের রণাঙ্গন
কমান্ডার সুধীর দাসের যুদ্ধের কাহিনী
- আপলোড সময় : ২৬-০৫-২০২৬ ১০:০২:২৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৬-০৫-২০২৬ ১০:০২:২৬ পূর্বাহ্ন
প্রাণকান্ত দাস::>
একাত্তরের রণাঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম উচ্চারণ করলেই মুক্তিযুদ্ধের করুণ দৃশ্য চোখের সামনে ঝলমল করে ভেসে ওঠে, যিনি ঐ সময় সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লার অনেক গ্রাম পাকসেনাদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে তার মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে হন্য হয়ে ছুটে গেছেন, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব অর্জন করেছেন - তিনি হলেন আমাদের ভাটি বাংলার সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্ব, গরিব-দুঃখী মেহনতি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, ভাটি বাংলার সিংহপুরুষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর বীর মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানি কমান্ডার সুধীর দাস।
তিনি ১৯৭১ সালে ২ জুলাই মা-বাবা-আত্মীয়-স্বজনসহ সকলের অগোচরে রাতের আঁধারে ২৫/৩০ জন যুবককে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ৫নং টেকেরঘাট সাবসেক্টরে চলে আসেন। এখানে তিনি ঐ সেক্টরের কমান্ডার সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ইন্ডিয়ান মেজর ভাট ও ক্যাপ্টেন ভার্মার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তারা তাকে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব দিয়ে মেঘালয়ের একটি ট্রেনিং সেন্টার বড়ছড়ায় পাঠিয়ে দেন। সেখান থেকে ইন্ডিয়ান ‘ইন্সট্রাক্টর শ্রী রাম নরেশ সিং’সহ ৩০ জন ভারতীয় প্রশিক্ষকের অধীনে একটানা ২৮ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
তিনি ট্রেনিং শেষে প্রথমেই আগস্টের প্রথম সপ্তাহে ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি সশস্ত্র দল নিয়ে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জয়কলস নামক স্থানে পাকসেনাদের একটি শক্ত ঘাঁটি আক্রমণের উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী ডুংরিয়া গ্রামে অবস্থান নেন। তিনি এখান থেকে গোপন সূত্রে জানতে পারেন, পাকসেনারা সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলে বিভিন্ন গ্রাম আগুন জ্বালিয়ে ও মানুষ হত্যা করে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ জয়কলস আক্রমণ না করে তার দল নিয়ে দিরাই উপজেলার দিকে অভিযানে বের হন। তিনি এখানে এসেই প্রথমে হারানপুর গ্রামে অবস্থান করেন। এর তিনি এখান থেকে খাগাউড়া গ্রামে পাকসেনাদের আক্রমণের সংবাদ পেয়ে তার দল নিয়ে সেখানে গিয়ে শত্রুদের উপর আক্রমণ শুরু করেন। এর ফলে শত্রুরা ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং গ্রাম শত্রুমুক্ত হয়।
এরপর তিনি আগস্টের শেষদিকে একই উপজেলার চরনারচর বাজারে এক যুদ্ধের সম্মুখীন হন। ঐ বাজারে মুক্তিযোদ্ধা জয়কুমার বৈষ্ণবের রাইস মিলে পাঞ্জাবী ও রাজাকাররা আগুন ধরিয়ে দিলে তিনি দূর থেকে আগুনের ধোয়া দেখতে পান। তিনি তা লক্ষ্য করে সেখানে পৌঁছে তার দল নিয়ে শত্রুদের উপর আক্রমণ শুরু করেন। প্রায় ৭ ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধে একজন পাঞ্জাবী ও একজন রাজাকার নিহত হয় এবং শত্রুরা একটি রাইফেল ও একটি হেলমেট ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এভাবে ঐ বাজার শত্রুমুক্ত হয়।
তিনি এরপর সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে একই উপজেলার চিতলিয়া গ্রামে শত্রুবাহিনীর আক্রমণের সংবাদ পেয়ে তিনি তার দল নিয়ে ঐ গ্রামের উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হন। কিন্তু ঐ গ্রামে পৌঁছার পূর্বেই পথিমধ্যে পাঞ্জাবীদের সঙ্গে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে একজন রাজাকার নিহত হয় এবং শত্রুসেনারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
অতঃপর অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় দিরাই থানায় পাঞ্জাবীদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি আক্রমণের উদ্দেশ্যে আরও তিনটি মুক্তিযোদ্ধা দলকে সংঘবদ্ধ করে তিনি একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। এই যুদ্ধে দীর্ঘ প্রায় ৭০ ঘণ্টা স্থায়ী সবচেয়ে ভয়ানক এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়। এই যুদ্ধ দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হওয়ার ফলে তারা থানার নিকট পৌঁছার পরেও তাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে পিছু হটতে বাধ্য হন। এই যুদ্ধে দুই রাজাকার নিহত হয় এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হরিধন দাস শীহদ হন।
তিনি এরপর নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে একই উপজেলার ভড়ারগাঁওয়ে পাঞ্জাবীদের আক্রমণের সংবাদ পেয়ে তার দল নিয়ে সেখানে অভিযানে বের হন। কিন্তু ভড়ারগাঁওয়ে পৌঁছার পূর্বেই ধাপকাই ও কদমতলি গ্রামের নিকট পাকসেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। তিনি সেখানে একটি ব্রিজের নিচে তার দল নিয়ে অবস্থান করে শত্রুসেনাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। এই যুদ্ধে এক মিলিশিয়া নিহত হয় এবং শত্রুবাহিনী ঐ স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
এরপর তিনি একই উপজেলার শ্যামারচর বাজারে পাঞ্জাবী ও রাজাকারদের একটি সর্ববৃহৎ ঘাঁটি আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত স্থির করেন। কিন্তু কীভাবে আক্রমণ করবেন - এর কৌশল নিয়ে মেজর মুসলেউদ্দীনের সাথে ওয়্যারলেসে যোগাযোগ করেন। এদিকে ইতিমধ্যেই মেজর মুসলেউদ্দীন তার বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধের ঘটনাবলি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ঐ ঘাঁটি আক্রমণের কৌশল সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়ে তাকে কোম্পানি কমান্ডারের পদমর্যাদায় উন্নীত করেন। তার নির্দেশ মতো ঐ এলাকার আরো তিনটি মুক্তিযোদ্ধা দলের কমান্ডারের সঙ্গে পরামর্শ করে ৬ ডিসেম্বর রাত ৩টায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি তার মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে শত্রুসেনাদের ঘাঁটি আক্রমণ শুরু করেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অন্য দুটি মুক্তিযোদ্ধা দল আক্রমণে অংশগ্রহণ করেনি। এমতাবস্থায় একটানা ১২ ঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকসেনাসহ রাজাকাররা তাদের চতুর্দিক ঘিরে ফেলে। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে শত্রুর মোকাবেলা করা দুঃসাধ্য হয়ে পরায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হন। এ সময় আঃ হামিদ নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। এর ফলে তিনি হাঁটতে না পেরে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন- “স্যার (সুধীর দাস) আপনারা আমাকে ফেলে যাবেন না।” তখন তার হাতে হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব বিধায় তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়ে বলেন, পাকহানাদের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে শহীদ হওয়াই শ্রেয়।” তখন এই আহত মুক্তিযোদ্ধা আল্লাহকে স্মরণ করে নিজের হাতের স্টেনগান দিয়ে নিজের বুকে গুলি করে শহীদ হন। এরপর তারা প্রাণপণ দৌড়ে কোনমতে এই স্থান ত্যাগ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে নিজেদের জীবন রক্ষা করেন।
এই যুদ্ধে ইজাব আলী নামে ১৪ বছরের এক বালক মুক্তিযোদ্ধা তার সাথে ছিল। সে অত্যধিক ছোট হওয়ায় তার সাথে দৌড়ে যেতে পারছিল না। সে তখন পিছিয়ে পড়ে দৌড়ে চিৎকার করে ডাকছিল- “স্যার (সুধীর দাস) আমাকে ফেলে আপনারা যাবেন না।” ছেলেটির করুণ ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তা ত্যাগ করে তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন। এক পর্যায়ে উপায়ন্তর না দেখে মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায় শত্রুদের মারমুখী আক্রমণের মুখে ধরা পড়ার ভয়ে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নিজের হাতের স্টেনগান তিন তিনটি বার নিজের বুকে লাগান। ঠিক ঐ মুহূর্তে কভারিং পার্টি হিসেবে একদল মুক্তিযোদ্ধা তাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলে তার বুকে পুনরায় সাহস সঞ্চয় হয়। তিনি তখন ছেলেটিকে বলেন, “আমি দাঁড়িয়ে আছি, তুমি এগিয়ে আস।” এভাবে তিনি আস্তে আস্তে এগিয়ে ছেলেটিকে সঙ্গে নিয়ে একটি নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কেটে আত্মরক্ষা করেন। কিন্তু পাকসেনারা তাদের পিছু ছাড়েনি। তারা তাদের হত্যা করবেই। শত্রুসেনারা দৌড়ে নদীর তীরে এসে তাদের লক্ষ্য করে বুলেট নিক্ষেপ করলে তিনি পৃষ্ঠদেশে বুলেট বিদ্ধ হন। সেই বুলেটের ক্ষত চিহ্ন নিয়ে তিনি গত ১৯/২/২০২৫ইং তারিখ আমাদের মাঝ থেকে চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে চলে যান।
এই ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে চার জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং তিনিসহ ছয় জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণ হলেন- ১. হেমেন্দ্র পুরকায়স্থ, গ্রাম : চরজটি, দিরাই। ২. আঃ হান্নান, গ্রাম : কালধর, দিরাই। ৩. আঃ মকদ্দস, গ্রাম : শ্যামারগাঁও, জগন্নাথপুর। ৪. আঃ হামিদ, গ্রাম : জগদল, দিরাই।
কমান্ডার সুধীর দাস জীবদ্দশায় বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে আমি অনেক যুদ্ধ করেছি। কিন্তু এমন ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আমি এর পূর্বে কখনো করিনি। এই যুদ্ধের ঘটনা মনে হলে আজও আমার শরীর শিউরে ওঠে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সুধীর দাস ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে কেউ তার সঙ্গে কথা বললেই তিনি অকপটে বীর যোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা বলে যেতেন। বিভিন্ন সময় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দেশ-বিদেশ থেকে অনেক সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক তার নিকট ছুটে আসতেন। এই বীর সৈনিকদের মৃত্যুর মাধ্যমে সেই সুযোগ চিরদিনের জন্য পরিসমাপ্তি ঘটলো।
তিনি পেশায় একজন শিক্ষক হিসেবেও জীবনে অনেক সুনাম অর্জন করেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সমাজ সংগঠক ও পরোপকারী ব্যক্তিত্ব। ছিলেন দিরাই-শাল্লা সম্প্রীতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা ও প্রাক্তন সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধে তার সীমাহীন ত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ সংগঠনটির পক্ষ থেকে গত ১৫/০৫/২০২৬ইং তারিখ সিলেট শহরের মদিনা মার্কেটস্থ দিশারী স্কুল এন্ড কলেজে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। তার মতো ন¤্র, ভদ্র ও শান্ত স্বভাবের মানুষ সমাজে খবুই কম দেখা যায়। তিনি ছিলেন গরিব দুঃখী মেহনতি মানুষের একজন অকৃত্রিম বন্ধু ও পরোপকারী ব্যক্তিত্ব। প্রায় প্রতিনিয়ত অনেক অসহায় মানুষ দিরাই-শাল্লা থেকে ছুটে আসতে তার সিলেটস্থ বাসায়।
আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু স্বীয় কর্মের মাধ্যমে তিনি যে নীতি, আদর্শ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন- তার জন্য তিনি আমাদের মাঝে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।
(দ্রষ্টব্য : আমি লেখক, ২০২২ সালে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার নিকট থেকে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে যা জেনেছি - তার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো নতুন প্রজন্মের উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে এই লেখায় উল্লেখ করেছি)
[লেখক : প্রাণকান্ত দাস, সাধারণ সম্পাদক, সিলেট বিভাগীয় কমিটি, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি এবং দিরাই শাল্লা সম্প্রীতি পরিষদ, সিলেট]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক